রুবিনা গনির বাসায় সেদিন পরিবারের লোকজনদের দাওয়াত ছিল। রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ বাম স্তনে ঝিলিক করে ওঠার মতো অনুভূতি হয়। পাত্তা না দিয়ে আবার কাজ করা শুরু করেন। ঝিলিক দেওয়া অনুভূতিটা আবার ফিরে আসে। কাউকে কিছু না বুঝতে দিয়ে টয়লেটে গিয়ে বাম স্তন হাত দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন হাতে দলার মতো কিছু একটা লাগে।

কোনো ব্যথা নেই। মনের ভেতর সন্দেহ দানা বাঁধল। তবে ওই দিন আর কাউকে কিছু বুঝতে দেননি। আগে নিজে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন। এক দিন পর বারডেমে অনকোলজিস্টের (ক্যানসার চিকিৎসক) কাছে গেলেন। পাঁচ দিনের দিন পরীক্ষায় ধরা পড়ল তিনি স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত।

রুবিনা গনি (৪৯) মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের কর্মসূচি পরিচালক (মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি)। গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে তাঁর অফিস কক্ষে বসে কথা হচ্ছিল প্রথম আলোর। চার বছর আগের ওই দিনের কথা হাসিমুখে বলে যাচ্ছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘এই হাসিই’ তাঁকে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করার শক্তি জুগিয়েছে। মরার আগে মরবেন না, সেই তাগিদে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়েছেন।

এখন আরও অনেক স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত নারীকে লড়াই করতে শেখান। তিনি এখন তাঁদের অনুপ্রেরণা। প্রতিবছর ১০ অক্টোবর স্তন ক্যানসার সচেতনতা দিবসে অনলাইনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি আশার কথা শোনান। তাঁর কথা, ‘মৃত্যুর কোনো গ্যারান্টি কি আছে? ক্যানসার না হলে কি মানুষ মারা যায় না! তাই মরার আগে ভয়ে মরে যাবেন না, প্লিজ। ক্যানসারে আক্রান্ত না হলেও যখন-তখন যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে আপনার মৃত্যু হতে পারে। ভয় না পেয়ে লড়াই করার শক্তি ধরে রাখুন।’

‘প্রতিটি তারিখ মনে আছে’
চার বছর আগের কথায় ফিরে গিয়ে রুবিনা গনি বলেন, ‘আমার বাসায় দাওয়াত ছিল ২০১৮ সালের ১৭ জুন। পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগের দিন। ক্যানসার কি না সেই সন্দেহ থেকে প্রতিবেশী এক নারী চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি পরামর্শ দিলেন বারডেমে অনকোলজিস্টের কাছে যেতে। ১৯ জুন চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিলেন।

২৪ জুন বেলা আড়াইটায় সব কটি পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাই। ওই সময় বড় বোনকে ফোন করে জানালাম ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার কথা।’ রুবিনা গনি বলেন, ক্যানসারের সময়ের প্রতিটি তারিখের কথা মনে আছে। দেরি না করে পরদিন ২৫ জুন অস্ত্রোপচারের জন্য বেসরকারি একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। অস্ত্রোপচারের ১৮ দিন পর কেমোথেরাপি শুরু হয়। তাঁর ক্যানসার ছিল প্রাথমিক অবস্থায়।

‘টাক মাথা না ঢেকে ঘুরেছি’
ছয় মাসের মধ্যে ৪টি কেমোথেরাপি, ২৫টি রেডিওথেরাপি ও ৫টি ইলেকট্রো থেরাপি নেন রুবিনা গনি। বাসা থেকে থেরাপি নিয়ে অফিসেও গিয়েছেন। যখন একেবারে শরীরে কুলাতো না, তখন ছুটি নিতেন। দুটি ছেলেমেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। ওদের পড়াশোনায় যেন ক্ষতি না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হতো। ছেলের বয়স তখন ১৪ আর মেয়ের ১০।

কেমোথেরাপি দেওয়ার ১৫ দিন পর মাথার চুলের গোড়ায় প্রচণ্ড ব্যথা হতে লাগল। মুঠো ভরে ভরে চুল উঠে আসত। চিকিৎসক চুল ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। অফিসের অনেকেই জানতেন না, তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত। তাই ন্যাড়া মাথায় তাঁকে অফিসে ঢুকতে দেখে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। ন্যাড়া মাথা নিয়ে মনের ভেতর অস্বস্তিকে কোনো জায়গা দেননি বলে জানালেন রুবিনা গনি।

তিনি বলেন, ‘টাক মাথা না ঢেকেই ঘুরেছি। আমার ক্যানসার, চুল ফেলে দিতে হবে—এ নিয়ে লজ্জার তো কিছু নেই। আমি ক্যানসারের প্রতিটি সময়ের ছবি তুলে রেখেছি। টাক মাথার ছবি তুলে রেখেছি। কখনো মনে হয়নি, টাক মাথায় আমাকে দেখতে খারাপ লাগছে।’

‘ক্যানসারের প্রতিটি সময় উদ্‌যাপন করেছি’
রুবিনা গনি বলেন, ক্যানসারের প্রতিটি সময়কে তিনি উদ্‌যাপন করেছেন। অন্যদেরও সেই পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘আমি মরার আগে মরতে চাইনি। ক্যানসারের সঙ্গে লড়েছি। সব সময় মনে হয়েছে, আমাকে বাঁচতে হবে। আমি না থাকলে সন্তান দুটিকে দেখার কেউ থাকবে না।

কখনো হাল ছেড়ে দিইনি। মনোবল ধরে রাখতে সব সময় হাসিখুশি থেকেছি। মন খারাপ হলে শরীরে কিছু হরমোন তৈরি হবে, যা শরীরকে খারাপের দিকে ঠেলে দেবে। বিষয়টি মাথায় রেখে নিজেকে খুব উৎফুল্ল রেখেছি। ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, স্বজন, সহকর্মী, বাড়ির কাজের সহায়তাকারী—প্রত্যেকের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছি। ক্যানসারে আক্রান্ত এক মানুষের সুস্থতার জন্য এই সহায়তাগুলো খুব জরুরি।’

অন্যদের জন্য এখন অনুপ্রেরণা তিনি
ক্যানসারে আক্রান্ত এক রোগীকে সুস্থ ঘোষণা করতে পাঁচ বছর সময় নেন চিকিৎসকেরা। এ সময়ে নির্দিষ্ট সময় অন্তর পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে দেখা হয় রোগের লক্ষণ ফিরে এসেছে কি না। রুবিনা গনি চার বছর পার করেছেন। নিয়মিত পরীক্ষায় তাঁর রোগের আর কোনো লক্ষণ ফিরে আসেনি। প্রতিটি পরীক্ষার ফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, তিনি সুস্থতার দিকে, শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি।

ক্যানসার অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ও অপরাজিতা ক্যানসার সোসাইটির সদস্য তিনি। ক্যানসারের অভিজ্ঞতা নিয়ে এখন তিনি অন্যদের সচেতন করার বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেন। আজ স্তন ক্যানসার সচেতনতা দিবসে ক্যানসার অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের একটি অনলাইন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। ব্যক্তিগতভাবেও তিনি স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতন করেন নারীদের। এ পর্যন্ত ৫০ জনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ব্যয়বহুল এই চিকিৎসায় অনেকের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে দেন।

সচেতনতা সৃষ্টির বিষয়ে রুবিনা বলেন, প্রত্যেক নারীকে নিজের স্তন স্ক্রিনিং করা শিখতে হবে। এতে কারও স্তন ক্যানসার হলে তিনি শুরুতেই বুঝতে পারবেন। শুরুতে চিকিৎসা নিলে সুস্থ হওয়া যায়।

নিয়ম মেনে খেতে হবে, জীবন যাপন করতে হবে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছেন, সচেতনতার মাধ্যমে কাউকে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করতে জানানো গেলে অনেকের জীবন বাঁচানো সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে নিজের এক আত্মীয়ের কথা তুলে ধরে রুবিনা গনি বলেন, কথায় কথায় ওই আত্মীয় নিজের সমস্যা তাঁকে জানানোর পর তিনি ওই আত্মীয়কে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে পাঠিয়েছিলেন।

ওই আত্মীয়ের স্তন ক্যানসার শুরুতেই শনাক্ত হয়েছিল। কিছুদিন আগে এক সহকর্মী তাঁর আত্মীয়ের স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার খবর জানিয়ে বলেন, ওই আত্মীয় মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছেন। রুবিনা গনি ওই নারীকে ভিডিও কল দেন কথা বলার জন্য। ওই নারীর সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘তাঁকে (সহকর্মীর আত্মীয়) দেখলাম সোজা হয়েও বসতে পারছেন না।

প্রচণ্ড বিমর্ষ। আমি ভাবলাম, তাঁকে কীভাবে উজ্জীবিত করব? অনেক ভেবে বললাম, ক্যানসার হলেই মরবেন, আর কিছুতে মরবেন না! এক ঘণ্টা কথা বলার পর তাঁর চেহারা বদলে গেল। আরেক দিন ফোন করে বললেন, চুল পড়ে যাচ্ছে। বললাম, ছোটবেলায় টাক হয়েছেন। এবার বড় হয়ে টাক হয়ে দেখেন। সুন্দরই লাগবে।’ রুবিনা বলেন, ‘সেই তিনি এখন সুন্দর করে সেজেগুজে হাসিমুখে টাক মাথায় ছবি তুলে পাঠান।’

রুবিনা গনির ভাষায়, ক্যানসারের একেকটি ধাপে একেক রকম শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যাগুলো নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে বেঁচে থাকার তাগিদেই। এ সময়টায় নিজের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য মনোবল ধরে রাখার কোনো বিকল্প নেই।

তথ্যসূত্র