২০২১ সাল। অক্টোবরের শেষ। দুর্গাপূজার রং–রোশনাইয়ের পর শহর কলকাতা যেন কিছুটা স্তিমিত। কোথায় যেন একটা বিষণ্নতার সুর। ঠিক এহেন সময়েই তার সঙ্গে আমার আলাপ, বলা যেতে পারে একেবারেই অকস্মাৎ। কাছেপিঠেই তিনি ছিলেন, কিন্তু এতটাই নীরব যে তার উপস্থিতি আমি বুঝতেই পারিনি। যখন বুঝলাম, পরিচয় যখন ঘটল এই রবাহুত অতিথির সঙ্গে, তখন উপলব্ধি হলো এই প্রাথমিক নীরবতা তার প্রকৃত পরিচয় নয়। আদতে তিনি একরোখা, জেদি, আক্রমণাত্মক। সহজে ব্যর্থতা স্বীকার করার পাত্রই নন। তাকে বাগ মানানো বেজায় কঠিন। এর সঙ্গে মোকাবিলায় নামা—খানিকটা অসম যুদ্ধই বলা যেতে পারে। যতই ঢাল–তলোয়ার, অস্ত্রশস্ত্র থাক না কেন, এ বড় কঠিন মোকাবিলা। এর চরিত্র, গতিবিধি, স্বভাব, ধর্ম কোনো কিছুই আগে থেকে আঁচ করা যায় না। একটি ব্যাপারই কেবল নিশ্চিত—এর আগমনী বার্তাতেই ফিকে হয়ে আসে জীবনের সব রং। মলিন, বিবর্ণ, বিরস, বেসুরো ঠেকে চারপাশ। এই ভয়ানক নিষ্ঠুর অতিথি হলেন কর্কট মহাশয়। ক্যানসার।

বছর দেড়েক আগে প্রথম যখন জানলাম যে আমার ব্রেস্ট ক্যানসার, ভয়ের চেয়ে যে প্রতিক্রিয়া প্রথমে হয়েছিল, তা হলো অবিশ্বাস। কলকাতায় রাজারহাটে টাটা মেডিকেল সেন্টারে সার্জেন রোজিনা আহমেদ যখন সবটা আমাকে বুঝিয়ে বলছেন, মনে হচ্ছিল অসুখটা আমার নিজের হয়নি, অন্য কারও সম্পর্কে শুনছি। গ্রাহ্যতার এতটাই অভাব ছিল সেই মুহূর্তে।

আমার অনকোলজিস্ট সঞ্জয় চ্যাটার্জি চিকিৎসাপদ্ধতির একটা সুষ্ঠু ধারা ঠিক করে কেমোথেরাপি শুরু করলেন। বিধি বাম। প্রথম কেমো নেওয়ার পরই ওষুধের মারাত্মক এবং বিরল প্রতিক্রিয়া হলো, কোমায় চলে গেলাম। চিকিৎসকদের নিরলস চেষ্টা, প্রিয়জনদের ভালোবাসা আর ঈশ্বরের আশীর্বাদে আবার ফেরতও এলাম। কেবল এই সাড়ে পাঁচ দিনের স্মৃতি জীবন থেকে চিরতরে মুছে গেল।

আবার নতুন করে চিন্তাভাবনা, চিকিৎসকদের আলাপ–আলোচনা, চিকিৎসাপদ্ধতির সামান্য অদলবদল এবং তারপর পুনরায় কেমোথেরাপি শুরু। প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত হাসপাতাল যাতায়াতের ফলে ক্রমেই যে ছবি ধীরে ধীরে আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল, তা হলো, ক্যানসার রোগটির চেয়ে বেশি কষ্টদায়ক তার চিকিৎসা। চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনায় জেনেছিলাম, আমার বিশেষ ধরনের রোগটির গালভরা নাম ট্রিপল নেগেটিভ ব্রেস্ট ক্যানসার এবং এটি ‘লোকালি অ্যাডভান্সড’।

প্রতি বৃহস্পতিবার ইনজেকশন, থার্মোমিটার, প্রেশার মাপার যন্ত্র, শিরা পাবে কি না তার টেনশন, তারপর ঘণ্টা দেড়েক ধরে শরীরজুড়ে কেমোর ওষুধের কষ্টদায়ক গতিবিধি। প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার এলেই শুরু হতো বুকের ধুকপুকানি। ঠিক পরীক্ষার আগে যেমনটা হতো। রোজ হাসপাতাল যাতায়াতের ফলে এই প্যানিক অ্যাটাকের বোধও ক্রমেই স্তিমিত হয়ে এল। এক ছাদের তলায় শুধুই ক্যানসার রোগীরা। নানা বয়স, নানা ধর্ম, নানা ধরন, নানা পর্যায়। মিল কেবল একটা জায়গায়, সবাই এক ভয়ানক যুদ্ধে শামিল। স্ট্রলারে চড়া শিশু থেকে হুইলচেয়ারে বসা ন্যুব্জ বৃদ্ধ, বছর পঁচিশের ছাপা শাড়ি পরা মিষ্টি বউয়ের হাত ধরে কেশবিহীন (কেমোর ফলে) তরুণ স্বামী, কিশোর ছেলের হাতের স্যালাইনের বোতলে চোখ রাখা উদ্বিগ্ন মা—এ এক অন্য দুনিয়া। যে দুনিয়া সাহস জাগায়, ভাবতে শেখায়, আমি একা নই। এমন আরও অনেক মানুষ আছেন, যে যাঁর মতো লড়ে যাচ্ছেন ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত জেনেও। এটাই চরম আশার কথা, ভরসার কথা, অন্ধকারের ভেতর একঝলক আলোর রেখা।

নিয়ম করে বৃহস্পতিবার সকাল আটটায় প্রেসক্রিপশন এবং জরুরি কাগজপত্রের ফাইল গুছিয়ে রওনা দেওয়াটা কেমন যেন একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল। মেনে নিতে শিখলাম, এটাই আমার সাময়িক রুটিন। বুঝতে শিখলাম, কেমোথেরাপির যন্ত্রণাই শেষ কথা নয়। চিকিৎসার অঙ্গমাত্র এবং এই থেরাপি সম্পূর্ণ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি অবর্ণনীয় মানসিক কষ্ট। কিছু ভালো না লাগা, হতাশা, নিকষ অন্ধকারময় জগৎ—এর সবই সত্যি, কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়। উপলব্ধিটা একবার আয়ত্ত করতে পারলে জানবেন, যুদ্ধে অনেকটাই এগিয়ে গেছেন আপনি। এ জন্য চাই মনের জোর। কথাটা আশপাশের মানুষজনের কাছ থেকে ক্রমাগত শুনতে শুনতে বিরক্ত লাগলেও এটাই একমাত্র অব্যর্থ উপায়। চিকিৎসকেরাও সারাক্ষণ এই পরামর্শই দেন। তবে এটা বলা যতটা সহজ, বাস্তবে অর্জন করা ততটাই কঠিন। পারিবারিক সহায়তা, বন্ধুবান্ধবের আদর-আশ্বাসের বড় প্রয়োজন। সামান্য একটু আশ্বাসের জন্য প্রাণটা কাঁদে এ সময়।

হ্যাঁ, মনের জোর ধরে রাখাটা সহজ কাজ নয়। তবে অসম্ভবও নয়। যে যাঁর মতো করে, নিজের নিজের সুবিধামতো খুঁজে নিতে হবে আলোর ঠিকানা। শিশুর মতো ছোট ছোট পা ফেলে এগোতে হবে। এই খোঁজায়ও আনন্দ আছে, এই খোঁজার নেশায় একবার বুঁদ হয়ে যেতে পারলে মেঘলা মন সজীব হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগবে না। বেশ মনে পড়ে, বালিশ থেকে মাথা তুলতেও যখন ঘোর অনিচ্ছা, সেহেন সময়ে শীতের মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে দশ মিনিট বসতে পারাতেও কী ভীষণ আনন্দ! মুখে সবকিছুই বিস্বাদ, সে সময় বন্ধুর পাঠানো কমলালেবুর স্যুপের স্বাদে অনাবিল সুখ!

হ্যাঁ, ক্যানসার এই ছোট্ট জিনিসগুলো ভালোবাসতে শিখিয়েছে। জীবনের ছোট ছোট পাওয়া, আপাতদৃষ্টে তুচ্ছ কোনো মুহূর্ত, নেহাতই চোখে না পড়া ঘটনাও যে মনে আনন্দের হিল্লোল তুলতে পারে, তা তো এই ক্যানসারের কাছেই শিখলাম। চিরাচরিত নঞ্চর্থক বিশেষণযুক্ত এই ব্যাধির অন্তরের অন্তস্থলেও যে এমন মণিমাণিক্য লুকিয়ে আছে, তা কি আগে জানতাম!

‘মরণব্যাধি’, ‘ভয়ানক’, ‘ভয়ংকর’—এমন সব তকমাই তো জুটেছে এর কপালে এবং এগুলোর একটিও মিথ্যে নয়। কিন্তু এরই ভেতর খুঁজে নিতে হবে চলার পথের রসদ। চলতে তো হবেই। থেমে থাকলে তো চলবে না। জীবন তো একটাই। সবাই যখন এসে বলতেন, ‘ইউ আর আ ফাইটার’, মনে মনে খুব রাগ হতো। আমি তো ফাইটার হতে চাইনি। কিন্তু পরে বুঝেছি, এ তো ঈশ্বরেরই ইশারা। তাই তো নির্দ্বিধায়, নিঃশর্তভাবে তাঁর ওপর সবকিছু ছেড়ে দিতে শিখলাম এই রোগের হাত ধরে। যে মুহূর্তে এই সত্য শিখে ফেললাম, সব শঙ্কা, উদ্বেগ, ভালো না লাগা, হতাশা নিমেষে উধাও। আর কিছুতে আমি ভয় পাই না। মৃত্যুকেও না। কেবলই মনে হয়, তিনি আছেন, তিনিই সামলাবেন। দায় চাপানোর এমন একজনকে একান্ত কাছের করে পেলে, তাঁকে ভালোবাসতে শিখলে আর কী চাই! মন দিয়ে খোঁজো, কী ভালো লাগে। যা ভালো লাগে, তা–ই করে যাও। খুশিমনে বাঁচো। এইটুকুই তো আমাদের হাতে। বাকিটা অন্তর্যামী জানেন।

এই গভীর দর্শন, জীবনের প্রতি ভালোবাসা, সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে শিখিয়েছে আমার ক্যানসার। গোড়ায় যাকে বলেছিলাম ভয়ানক, নিষ্ঠুর, আগ্রাসী, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে–ই হয়ে উঠল আমার বন্ধু, ফিলোসফার ও গাইড। তাকে কুর্নিশ জানাই।

লেখক: ভারতের লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন সানন্দার সাবেক সম্পাদক

তথ্যসূত্র