কিশোর বয়সেই ক্যান্সার আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেই থেকে লড়ছেন, হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে অন্যদেরও সাহস জোগাচ্ছেন। কিছুদিন আগে ক্যান্সার থেকে মুক্ত হয়ে সরকারি চাকরিতেও যোগ দিয়েছেন। এখন গবেষণা করছেন ক্যান্সার নিয়েই। দেশে বিশ্বমানের ক্যান্সার হাসপাতাল গড়তে চান নূর-এ-সাফী আহনাফ। নিজের সংগ্রাম ও স্বপ্নের গল্প শোনালেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

৯ বছর আগে ঠিক অক্টোবরেই জেনেছিলাম, শরীরে বাসা বেঁধেছে ব্লাড ক্যান্সার। তখন মোটে ১৫ বছর বয়সী কিশোর আমি। ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল রাষ্ট্রনায়ক হওয়া। কেউ কারণ জানতে চাইলে বলতাম দেশটাকে খুব সুন্দর করে, নিজের মনের মতো করে সাজাব। সমাজে খারাপ কিছু দেখলেই ভাবতাম যখন রাষ্ট্রনায়ক হব, তখন এগুলো থাকবে না। পুরো দেশের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলাম; কিন্তু স্রষ্টা আমায় বিশেষ এক দায়িত্ব দিয়ে পাঠালেন। ক্যান্সার ধরা পড়ার পর থেকে সব কিছু কেমন বদলে যেতে লাগল—জীবন, স্বপ্ন সবই। শুরুতে বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছিল আগের চেয়ে আরো বেশি ম্যাচিউরড, স্বপ্নবাজ এবং আরো বেশি শক্ত এক ‘আমি’কে খুঁজে পেলাম। সঙ্গে পেলাম অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা।

তারা সবাই একা
ক্যান্সার নিয়ে লড়তে গিয়ে পরিচয় হলো হাজারো ক্যান্সার যোদ্ধার সঙ্গে। তাদের কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখলাম। নিজের পাশাপাশি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে লড়াই শুরু করলাম। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করলাম—লিউকেমিয়া অ্যান্ড লিম্ফোমা সোসাইটি অব বাংলাদেশ। ক্যান্সার রোগীদের হাসিখুশি রাখাই ছিল উদ্দেশ্য। চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে দেখলাম অনেক বাংলাদেশি। তাদের কথায় একটা জিনিস ফুটে উঠল—তারা সবাই একা! এমনও অনেকে আছে, যাদের পরিবারেরও কেউ সহায়তা করে না। ভাবলাম, এদের কিভাবে এক প্ল্যাটফরমে আনা যায়। সবাই মিলে কিভাবে হাসিখুশি থাকা যায়। সে জন্য ওই সোসাইটি। আজ দেশের ৬৮ হাজার ক্যান্সার যোদ্ধা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে জড়িত। ক্যান্সার নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের সঙ্গেও যুক্ত আমি। ক্যান্সার আমায় নতুন জীবন দিয়েছে। পার্থিব চাওয়া-পাওয়া, লোভ, মোহ—এসবের বাইরেও যে সুন্দর এক জগৎ আছে, তা ক্যান্সার না হলে জানতামই না।

অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে
ক্যান্সার যোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একেকজনকে তিলে তিলে পরিবার ও সমাজের অসহযোগিতায় শেষ হতে দেখেছি। আমাদের সংগঠনে এমনও ক্যান্সার যোদ্ধা রয়েছে, যার বাবা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। এমনও শিশু পেয়েছি, যার অভিভাবক হাসপাতালে রেখে পালিয়ে গেছে। একজনের দীর্ঘ আট বছরের ভালোবাসার সম্পর্ক ভেঙে গেছে শুধু এক রাতের এক রিপোর্টে। হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় থাকা স্ত্রীকে ফেলে রেখে যেতে দেখেছি স্বামীকে। আবার ভালোবাসার নামে আগলে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমাজ কিংবা পরিবারের দোহাই দিয়ে একেকজন ক্যান্সার যোদ্ধার স্বপ্ন চুরমার করে দিয়ে যেতেও দেখেছি অনেককে।

ভুলগুলো ভাঙতে চেয়েছি
এই মানুষদের প্রতি সমাজের ভুল ধারণা কিংবা অবহেলার অন্ত নেই। শুরু থেকেই চেষ্টা করেছি ভুলগুলো ভেঙে দিতে। কিন্তু মুখের কথায় চিড়া ভেজে না। এ জন্য প্রমাণ করে দেখাতে হয় সমাজকে। কলেজের সময়টা বেশির ভাগই কেটেছে ভারতে, চিকিৎসার জন্য। দেশে থাকলেও রোজ দুবেলা ওরাল কেমো নিয়ে সকালে ক্লাস করা সম্ভব হতো না। তবু ক্যান্সার নিয়ে এইচএসসি দিয়ে ঢাকা বোর্ডে মেধাতালিকায় স্থান করে নিয়েছিলাম। এরপর ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যালে চান্স পেলাম।

কিন্তু মেডিক্যালে পড়া হয়নি। কারণ আমার রোগ প্রতিরোধক্ষমতা খুবই কম। তাই হাসপাতালে বেশি যেতে মানা। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম অর্থনীতিতে। স্নাতকোত্তরও সম্পন্ন করলাম।

এখন পিএইচডি করছি
করোনায় ক্যান্সার যোদ্ধারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে খুব দ্রুত। তাদের পাশে থাকাটা খুব জরুরি। তাই নতুন করে পড়াশোনা শুরু করলাম মনোবিজ্ঞান নিয়ে। এমএসসি করলাম কাউন্সেলিং সাইকোথেরাপিতে ভারতের সিঙ্গানিয়া ইউনিভার্সিটিতে। এখন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে পিএইচডি করছি। আমার গবেষণার বিষয়ও ক্যান্সার। ক্যান্সার যোদ্ধাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে ক্যান্সারের কী সম্পর্ক তা নিয়েই গবেষণা। এর অধীনে এরই মধ্যে তিন শতাধিক ক্রনিক মায়েলয়েড লিউকেমিয়া (এক ধরনের ব্লাড ক্যান্সার) সার্ভাইভরদের নিয়ে জরিপ করেছি। দেখেছি, এদের ৯৭ শতাংশই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার বছরখানেক আগে অতিমাত্রায় হতাশায় ভুগেছে। মানুষের এই মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে শরীরের বড় সংযোগআছে। এটা নিয়েই গবেষণা করছি।

অবশেষে সুখবর এলো
দীর্ঘ ৯ বছর লড়ার পর কয়েক মাস আগে জানলাম আমি ক্লিনিক্যালি রিমিশনে এসেছি। মানে ক্যান্সার মুক্ত। তবু প্রটোকল অনুযায়ী দুবেলা ওরাল কেমো চলছে। ৯ বছর ধরে এটা রুটিনে পরিণত হয়েছে। ওরাল কেমোর সাইড ইফেক্টগুলোও সয়ে গেছে। এসব নিয়েই জীবনটা উপভোগ করছি প্রতিদিন নিজের মতো করে। একটা মুহূর্তও আমার কাছে বড্ড দামি। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই উপভোগের চেষ্টা করি।

তথ্যসূত্র