মার্চের ২৩ তারিখ আমার বায়োপসি রিপোর্ট এল।চিকিৎসক ঘোষণা দিলেন, আমার ক্যানসার হয়েছে। সেদিন ছিল আমার একমাত্র সন্তান আদৃতের জন্মদিন। বাড়িতে উৎসবের বদলে বিষাদের সুর বেজে উঠল। মা-ছেলে মিলে সেদিন জড়াজড়ি করে কেঁদেছিলাম।

এমনিতে আমি কাজপাগল মানুষ। কাজের মধ্যে থাকতে বেশি ভালোবাসি। ২০২১ সালটাও কাজের ব্যস্ততায় কেটেছে । এর মধ্যেই হঠাৎ খেয়াল করলাম, শরীর বেশ খারাপ লাগছে। এমন খারাপ আগে কখনো লাগেনি। অসম্ভব ক্লান্ত লাগত আর শুধু ঘুম পেত। খাবারেও অরুচি। কোনো কাজই করতে পারতাম না। এমন কেন হচ্ছে, বুঝতে না পেরে ডাক্তারের শরণাপন্ন হই। সার্জন ডাক্তার সালমা সুলতানা কোর বায়োপসি টেস্ট দিলেন। রিপোর্টে সেই ফলাফলই এল, যা কখনো ভাবনাতেই ছিল না। আমার ক্যানসার।

ততদিনে আমি ক্যানসারের দ্বিতীয় পর্যায়ে আছি। কখন এই অসুখ শরীরে এসে বাসা বাঁধাল, টেরও পাইনি। ফলে স্বভাবতই রিপোর্টটা পাওয়ার পর খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলাম। করোনায় দেশ তখন বিপর্যস্ত। এর মধ্যেই শুরু হলো চিকিৎসা, যার প্রথম ধাপ ছিল নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সব শেষ করার পর চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রথমে কেমোথেরাপি দেওয়া হবে, এরপর সার্জারি। সার্জারি শেষ হলে রেডিওথেরাপি।

শুরু হলো কেমোথেরাপি। একেকটা কেমোর মাঝখানে বিরতি ছিল কেবল ১৪ দিন। প্রথম কেমোর পরই অসুস্থ হয়ে পড়ি। তবে শরীরে না কুলালেও মনে মনে স্থির করি, যেভাবেই হোক এই যুদ্ধ আমাকে শেষ করতেই হবে। সারাটা দিন আমাকে নিয়ে হাসপাতালে কাটাত বড় বোন। খুব কাছের কিছু মানুষ ছাড়া কাউকেই আমি এই যুদ্ধের কথা বলিনি। মনে হতো, আগে যুদ্ধে জয়ী হই, এরপর সবাইকে জানানো যাবে। কারণ, মনে হয়েছিল ওই সময় জানলে সবাই করুণা বা সহানুভূতি দেখাবে, যা আমাকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে। এক অজানা আতঙ্ক ও ভয়ও আমাকে পেয়ে বসেছিল। আমার সন্তান আদৃত আমার এই লড়াইয়ে অনেক ধৈর্য ও সাহসের পরিচয় দিয়েছে।

কেমো দেওয়ার পর ১০ দিন আমি বিছানা থেকেই উঠতে পারতাম না।সেই ১০ দিন পরিবাগে আমার বোনের বাসায় থাকতাম। বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাখিদের উড়াউড়ি দেখতাম, আকাশ দেখতাম। আর ভাবতাম, জীবনটা আবার কবে স্বাভাবিক হবে! ৪টি কেমোর পর ইভালুয়েশন করে দেখা গেল, শেষ কেমো খুব একটা কাজ করেনি। কেমো আংশিক সাড়া দিয়েছে। ডাক্তার তখন দ্রুত সার্জারির সিদ্ধান্ত নিলেন। সার্জারির ২১ দিন পর আবার শুরু হলো কেমো। আরও চারটি কেমো গেল, শেষ চারটি কেমোর সাইকেল ছিল একুশ দিনের। তখনই সিদ্ধান্ত নেই, এই অবস্থার মধ্যেই কাজ করব। কেমো শেষ হওয়ার ১০ দিন পর যখনই বিছানা থেকে উঠতে পারতাম, ছবি তুলতে বের হয়ে যেতাম। আমার যে ক্যানসার, কাউকেই সেটা বলতাম না। মনে হতো, ক্যানসার শোনার পর কেউ যদি কাজ না দেয়,অসুস্থ মনে করে যদি ফিরিয়ে দেয়। ভেতরে-ভেতরে যা-ই হোক, বাইরে একদম সুস্থ-স্বাভাবিক থাকতাম। আমার এক ছোট ভাই আছে, জনাথন, কাজের সময় সে আমাকে সহযোগিতা করত। কাজ করতে গিয়ে কোনোভাবেই যেন অসুস্থ হয়ে না পড়ি, সেদিকে খেয়াল রাখত।

শেষ কেমোর দিনটা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে আনন্দের। কারণ, ক্যানসার চিকিৎসায় কেমোথেরাপিই সবচেয়ে কষ্টের ও যন্ত্রণার। শেষ কেমোথেরাপি দেওয়ার পর মনে হলো, জীবন আবার ফিরে পেলাম। সেদিন আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ি। কেমো শেষ হওয়ার ২১ দিন পর শুরু হলো রেডিওথেরাপি। সেটিও ছিল কষ্টের, কিন্তু আমি জানি, যেভাবেই হোক আমাকে এই যুদ্ধ শেষ করতে হবে। নিজেকে কাজের মাঝে যতটা পারি ব্যস্ত রাখতাম। পাগলের মতো কাজ করতাম। কাজে থাকার কারণে মনেই হতো না আমি অসুস্থ। মানসিকভাবে নিজেকে সুস্থ ভাবতাম সারাক্ষণ। বাজার করা, রান্না করার মতো নিয়মিত কাজগুলোও চালিয়ে গেলাম। মাস দুয়েক আগের ফলাফল বলছে, আপাতত আমি ক্যানসারমুক্ত। তবে এটা যেহেতু অ্যাগ্রেসিভ ক্যানসার, তাই দুই বছরের মধ্যে ফিরে আসার আশঙ্কা আছে। এই কারণেই এখন আমার ইমিউনোথেরাপি চলছে। ১০টি সাইকেল শেষ হলো, আরও ১৭টি বাকি। ভীষণ ব্যয়বহুল এই থেরাপির জন্য আমি এখন অনকোলজিস্ট সেলিম রেজার তত্ত্বাবধানে আছি।

ক্যানসারের চিকিৎসা অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি। তাই ধৈর্য ও মনোবলটাই সবচেয়ে জরুরি। ক্যানসারকে আমার জীবনের একটা নতুন জার্নি হিসেবেই দেখছি। এটা এমন একটা অভিজ্ঞতা, যা থেকে আমি জীবনের মূল্য কতখানি, তা শিখেছি। সবকিছু ইতিবাচকভাবে ভাবতে শিখেছি। সেই সঙ্গে আমার পরিবার ও সৃষ্টিকর্তার কাছেও কৃতজ্ঞতা, তাদের কারণেই এই কঠিন পথটা পাড়ি দিতে পেরেছি।

লিখেছেনঃ জয়িতা তৃষা

তথ্যসূত্র