প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব

ক্যান্সার প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সবার একত্রিত হতে হবে।

কেমোথেরাপি

কেমোথেরাপি কি?
কেমোথেরাপি মূলত এমন ধরনের এক চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের জন্ম এবং বৃদ্ধিকে ব্যাহত করা হয়। রোগীকে কী মাত্রায় কেমোথেরাপি দেয়া হবে তা নির্ভর করে ক্যান্সার টিউমারের আকার এবং বিস্তৃতির ওপর।  

কেমোথেরাপি কেন দেয়া হয়?

  • ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার জন্য।
  • কোষের বৃদ্ধি বন্ধ করার জন্য।
  • ক্যান্সার কোষের বিভাজন রোধ করার জন্য।
  • ক্যান্সার কোষে পুষ্টি সরবরাহ বন্ধ করার জন্য।
  • রোগীর ব্যথা উপসম করার জন্য।
  • বেঁচে থাকার সময় বৃদ্ধির জন্য।

কেমোথেরাপি কখন দেয়া হয়?

  • প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সার একেবারে নিরাময় করার জন্য এটি দেয়া হয়।
  • ২য় ও ৩য় পর্যায়ের ক্যান্সার রোগীর ক্ষেত্রে ক্যান্সার কোষের বিস্তার রোধ করার জন্য দেয়া হয়। দীর্ঘমেয়াদী থেরাপি প্রয়োগ করে রোগীর রোগ সংক্রমণ বন্ধ করা যায়।
  • ৪র্থ পর্যায়ের রোগীর ব্যথা ও শারীরিক জটিলতা হ্রাস করার জন্য দেয়া হয়।
  • অনিরাময়যোগ্য ক্যান্সারের ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যুর সময় বিলম্বিত করা হয়।
  • টিউমার কোষের বৃদ্ধি হ্রাস করার জন্য ব্যবহার করা হয়। টিউমার অপারেশনের আগে টিউমারের আকৃতি ছোট করা হয়। এরপর সহজে এটি অপসারণ করা হয়।
  • অপারেশনের পরবর্তী সংক্রমণ রোধ করার জন্য এই থেরাপি দেয়া হয়।

কেমোথেরাপি কিভাবে দেয়া হয়?

১) শিরার মাধ্যমেঃ হাতের শিরা বা ধমনিতে সরাসরি ক্যানোলা লাগিয়ে স্যালাইনের মাধ্যমে কেমোথেরাপির ঔষধ প্রবেশ করানো হয়। রোগীর শরীরে ক্যান্সারের ধরণ এবং শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী কেমোথেরাপি ঔষধ নির্ধারন করা হয়।  কেমোথেরাপির ধরণ অনুযায়ী ৪-৫ ঘন্টাতেও কেমোথেরাপি শেষ হতে পাবে, অথবা কিছু কিছু কেমোথেরাপির প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েকদিন পর্যন্ত লাগতে পারে। কেমোথেরাপি চলাকালীন রোগীকে সার্বক্ষণিক খেয়াল রাখতে হবে। ঔষধের রিয়েকশন হচ্ছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে। রোগী শারীরিকভাবে কেমন বোধ করছে জিজ্ঞাস করতে হবে।

২) ট্যাবলেটের মাধ্যমেঃ ট্যাবলেটের সাথে ঔষধ মেশানো থাকে সেটি পানি দিয়ে গিলে খেতে হয়। যেসব রোগীর ক্যান্সার কোষ প্রাথমিক পর্যায়ে আছে বা তেমন ছড়ায় নি তাদের জন্য এই ট্যাবলেট থেরাপি বেশি ব্যবহার করা হয়।

৩) ক্রিমঃ ক্রিমের সাথে ঔষধ মেশানো থাকে ক্রিমটি ত্বকের উপর মালিশ করা হয়। সাধারনত ত্বক ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের ক্রিম ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হয়।

কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

এই থেরাপির সাহায্যে যেহেতু ক্যান্সার কোষের সাথে ভালো কোষও কিছুটা মারা যায় সেহেতু এর প্রভাবে অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখাযায়।

  • চুল উৎপাদনের জন্য দায়ী গ্রন্থি থেরাপির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাই রোগীর চুল পরে যায়।
  • মনোসংযোগে ব্যাঘাত ঘটে।
  • বমি ভাব হতে থাকে।
  • শরীর ব্যাথা হতে পারে।
  • ত্বক এবং নখ শুকিয়ে আসে।
  • মেজাজ খিটখিটে থাকে।
  • দ্রুত মনের অবস্থা পরাবর্তন হয়।
  • খেতে ইচ্ছা করে না।
  • মুখে ঘা হতে পারে।
  • ওজন কমে যায়।
  • ত্বকের লাবণ্যতা কমে যায়।

কেমোথেরাপি পরবর্তী যত্ন

থেরাপি শেষ হলে রোগী যাতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কাটিয়ে উঠে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে সেজন্য বেশ কিছু পরামর্শ মেনেচলা উচিত।

  1. আমিষ বা প্রোটিনজাতীয় খাবার খেতে হবে।
  2. চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
  3. ভিটামিন সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক খাবার বেশি খেতে হবে কারণ এ সময় ভিটামিনের প্রয়োজন বেশি হয়।
  4. বেশিক্ষণ তীব্র সূর্যের আলোর নিচে থাকা যাবে না।
  5. পরিশ্রমী কাজ করবেন না।
  6. চিকিৎসক যে ব্যায়াম করতে বলবেন, সেগুলো নিয়মিত করুন।
  7. ধূমপান,মদ্যপান,নেশার দ্রব্য গ্রহণ করবেন না।

থেরাপির পূর্বে চিকিৎসক থেকে কি কি বিষয় জেনে নেয়া প্রয়োজন?

  • এই চিকিৎসার সুবিধাগুলো কি কি?
  • চিকিৎসার ঝুঁকিগুলো কি কি? পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি কি?
  • থেরাপির আগে কি কি পরীক্ষা বা স্ক্যান করতে হবে?
  • মোট কতটি কেমোথেরাপি নিতে হবে? কত দিন পর পর?
  • এই হাসপাতালে কেমোথেরাপি টিম দক্ষতার সাথে কাজ করে কিনা খোঁজ নিন। কেমোথেরাপি চলাকালীন একজন অনকোলজিস্ট সার্বক্ষণিক থাকবে কিনা জেনে নিন।
  • কেমোথেরাপির ওষুধের খরচ, হাসপাতালের বিছানার খরচ, অন্যান্য ঔষধের খরচ কেমন বিস্তারিত জেনে নিন।
  • চিকিৎসা চলাকালীন কতদিন পর পর ফলো-আপের জন্য আসতে হবে?
  • পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে কি করা উচিত?
  • জরুরি যোগাযোগের জন্য কোনো মোবাইল নাম্বার আছে কিনা।

তথ্যসুত্র ১তথ্যসূত্র ২তথ্যসূত্র ৩

থেরাপি দেয়ার আগে রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয় সে থেরাপির সাইড ইফেক্ট সহ্য করতে পারবে কি না। পূর্বের থেরাপির রেকর্ড পর্যালোচনা করা হয়। চিকিৎসার অগ্রগতি ও ক্যান্সার কোষের ধ্বংস হওয়ার হার পর্যবেক্ষণ করা হয়। সিটিস্ক্যান, এক্সরে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি,রক্ত,মূত্র ইত্যাদি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের বিস্তার ও প্রকৃতি সনাক্ত করা হয়।

কেমোথেরাপির ঔষধের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।  বমি ভাব, মুখে ঘা, শরীর ব্যাথা, মাথা ব্যাথা, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেশিতে টান – ইত্যাদি হতে পারে। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ঔষধ খেতে হতে পারে।

কেমোথেরাপি চলাকালীন রক্তের হিমোগ্লোবিন, প্লাটিলেট কমে যেতে পারে। হিমোগ্লোবিন বাড়াতে আনার, বিটরুটের জুস খেতে হবে। বিভিন্ন শাক এবং আমিষের সাথে লেবুর রস মিশিয়ে খেতে হবে, কারণ ভিটামিন সি সাধারণত আয়রন পরিশোষণে সহায়তা করে।