প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব

ক্যান্সার প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সবার একত্রিত হতে হবে।

কিছু গাইডলাইন

প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। তাই স্বাস্থ্যকর এবং পুষ্টিকর খাবার খান, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করুন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এড়িয়ে চলুন।

ক্যান্সারের সাধারণ লক্ষণগুলো যেমনঃ দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, আকস্মিক ওজন হ্রাস, দীর্ঘদিনের ব্যথা, অস্বাভাবিক মাংসপিণ্ড, ঘন ঘন জ্বর, দীর্ঘস্থায়ী কাঁশি, অকারণে রক্তক্ষরণ, খাবার গ্রহণে সমস্যা ইত্যাদি থাকলে অবহেলা না করে অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কিছু কিছু ক্যান্সার আছে কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। তাছাড়া, পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে কারো যদি ক্যান্সার থেকে থাকে তাহলে পরিবারের সবার নিয়মিত স্ক্রিনিং বা টেস্ট করে নেওয়াই উত্তম।

প্রাথমিক স্ক্রিনিং এ ক্যান্সার ধরা পরলে, একজন অভিজ্ঞ ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের (অনকোলজিস্ট) কাছে পরামর্শ নিতে হবে। তিনি বিভিন্ন টেস্ট যেমনঃ কোর বায়োপ্সি, বা ইমেজিং টেস্টের মাধ্যমে ক্যান্সারের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। প্রয়োজনে একাধিক অনকোলজিস্টের সাথে পরামর্শ করুন, ভিন্ন ভিন্ন ল্যাবে একাধিক পরীক্ষা করুন ।

ক্যান্সার একেক রোগীর জন্য একেক রকম। ক্যান্সারের ধরণ, চিকিৎসা পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন। তাই, অন্য কোনো ক্যান্সার রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করা বা তুলনা করা একদমই উচিত না। যা যা জানতে চান, বুঝতে চান – তা সরাসরি ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করুন।
সবার সাথে ক্যান্সার বিষয়ক আলোচনা করাও উচিত না। যার সাথে কথা বললে সঠিক তথ্য পাওয়া যেতে পারে, যাদের সাথে কথা বললে মনের কষ্ট কমবে, যারা এই কঠিন পরিস্থিতি বুঝতে পারবে এবং আপনাকে সাপোর্ট দিবে – তাঁদের সাথে আলোচনা করুন। ভুল মানুষের সাথে আলোচনা করে মনের কষ্ট বাড়ানো যাবে না, ভুল তথ্য গ্রহন করা যাবে না।
চিকিৎসা শুরু করার পূর্বে চিকিৎসক থেকে চিকিৎসার প্ল্যান, পদ্ধতি, সময়, খরচ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো ভালোভাবে জেনে নিতে হবে। প্রয়োজনে একাধিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ক্যান্সার রোগীর পাশে সবসময় একজন থাকা উচিত। রোগীর শারীরিক অবস্থা খেয়াল রাখতে হবে। মানসিকভাবে সাপোর্ট দিতে হবে। রোগীর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে হবে যেন যেকোনো সুবিধা-অসুবিধায় রোগী সবকিছু বলতে পারে। রোগীকে আনন্দের মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন। বাসায় বসে মোবাইলে নাটক, সিনেমা দেখাতে পারেন, গল্প করতে পারেন।
যেকোনো চিকিৎসা পদ্ধতি (যেমন সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ইত্যাদি) শুরু করার পূর্বে বিস্তারিত জেনে নিন। যেমনঃ এই চিকিৎসার সুবিধাগুলো কি কি? চিকিৎসার ঝুঁকিগুলো কি কি?পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি কি? কি কি পরীক্ষা বা স্ক্যান করতে হবে?কত দিন চলবে এই চিকিৎসা?ওষুধের খরচ, হাসপাতালের বিছানার খরচ, অন্যান্য ঔষধের খরচ কেমন বিস্তারিত জেনে নিন, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে কি করা উচিত? জরুরি যোগাযোগের জন্য কোনো মোবাইল নাম্বার আছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি।
প্রতিবার চিকিৎসকের কাছে যাবার আগে একটা কাগজে নোট করে নিন কি কি বিষয়ে উনাকে অবগত করা দরকার, কি কি প্রশ্ন করা দরকার। এতে কোনো জরুরি বিষয় জেনে নিতে ভুলে যাবেন না।
ক্যান্সারের ধরণ এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী খাবারের তালিকা তৈরি করার জন্য একজন পুষ্টিবিদ দেখানো খুব জরুরি। কেমোথেরাপি চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে খাবারে অরুচি থাকে, তারপরও জোর করে খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। যেহেতু কেমোথেরাপি রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, তাই খাবারের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। ফলের চামড়া গভীরভাবে কেটে ফেলে দিয়ে খেতে হবে। পাতলা চামড়ার ফল (যেমনঃ আঙ্গুর) খাওয়া যাবে না। মাটির নিচের সবজি এবং বাইরের খাবার যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। হিমোগ্লোবিন বাড়াতে আনার, বিটরুটের জুস খেতে হবে। বিভিন্ন শাক এবং আমিষের সাথে লেবুর রস মিশিয়ে খেতে হবে, কারণ ভিটামিন সি সাধারণত আয়রন পরিশোষণে সহায়তা করে।
রোগীর পাশাপাশি রোগীর পরিবারের সদস্যদেরও সুস্থ্য থাকা খুব জরুরি, কারণ পরিবারের সদস্যরা সুস্থ থাকলে রোগীর যত্ন সঠিকভাবে করা সম্ভব হবে।
বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি কিভাবে কাজ করে, চিকিৎসক যে যে ঔষধগুলো দিয়েছেন সেগুলোর কাজ কি, পার্শপ্রতিক্রিয়া কি – ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রয়োজনে ইন্টারনেটে বিশ্বাসযোগ্য সোর্স (জাতীয় পত্রিকা, জাতীয় টিভি চ্যানেল এর ওয়েবসাইট, বা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল) থেকে রিসার্চ করে দেখতে পারেন।

ক্যান্সার চিকিৎসা পদ্ধতি অনেক সময়সাপেক্ষ। ধৈর্যের সাথে জ্ঞান-বুদ্ধি-বিচক্ষনতা দিয়ে চিকিৎসার সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। চিকিৎসা শেষে অনকোলজিস্টের পরামর্শমত (১ মাস/৩ মাস/৬ মাস) পর পর বিভিন্ন টেস্টের মাধ্যমে ফলোআপ করতে হয়। নিয়মিত ফলোআপ খুব জরুরি।