প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব

ক্যান্সার প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সবার একত্রিত হতে হবে।

থাইরয়েড ক্যান্সার কি?

থাইরয়েড গ্রন্থি ঘাড়ের নিচের অংশে পাওয়া একটি ছোট প্রজাপতির আকৃতির গ্রন্থি। এটি একটি এন্ডোক্রাইন গ্রন্থি যা বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে। এটি ছাড়াও, এটি হরমোনের উৎপাদনে কাজ করে এবং হৃদযন্ত্র, শক্তির ব্যবহার, রক্তচাপ, তাপ উৎপাদন, অক্সিজেন খরচ, ওজন নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি অনেক শারীরিক কাজে সাহায্য করে। থাইরয়েড উদ্দীপক হরমোন (টিএসএইচ) হিসাবে, যা থাইরয়েড গ্রন্থির কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।

থাইরয়েড ক্যান্সার, এক প্রকার এন্ডোক্রাইন ক্যান্সার, যখন থাইরয়েড গ্রন্থির কোষ পরিবর্তন বা পরিবর্তন হয় তখন বিকশিত হয়। থাইরয়েডের অস্বাভাবিক কোষগুলি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং একবার তারা পর্যাপ্ত আকারে পরিণত হলে টিউমার গঠন করে।

বিশ্বব্যাপী ২৫ মে আন্তর্জাতিক থাইরয়েড ক্যান্সার দিবস পালিত হয়।

থাইরয়েড ক্যান্সারের লক্ষণঃ

থাইরয়েড গ্রন্থির কোনো অংশের কোষ সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেলে তাকে থাইরয়েড ক্যানসার বলে। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং স্ক্রিনিং টেস্ট করিয়ে নিন।

  • ঘাড়ের সামনের অংশে মাংসপিণ্ড সৃষ্টি হওয়া (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয় না)।
  • খাবার গিলতে সমস্যা বা শ্বাসক্রিয়ায় অসুবিধা। থাইরয়েড টিউমার শ্বাসনালির ওপর চাপ সৃষ্টির ফলে শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
  • স্বরে কর্কশতা। থাইরয়েড টিউমার স্নায়ুকে আক্রান্ত করলে গলার স্বর পরিবর্তন হতে পারে। গলার স্বর মোটা বা ফ্যাসফ্যাসে হতে পারে।
  • কন্ঠনালীতে বা ঘাড়ের চারপাশে ব্যথা এবং কাশি।
  • চুল পড়ে যাওয়া।
  • ক্ষুধামান্দ্য এবং ওজন কমে যাওয়া।
  • গলার চারপাশে ফোলাভাব।
  • ঘাম হওয়া। গরম আবহাওয়া সহ্যের অক্ষমতা।
  • ঋতুচক্রে অনিয়ম।
  • এ সময় খেয়াল রাখতে হবে বংশে বা পরিবারে কারও থাইরয়েড ক্যানসারের ইতিহাস আছে কিনা।
  • থাইরয়েড গ্রন্থির আশপাশে একটি বা একাধিক টিউমার হতে পারে, উভয় পাশে টিউমার হতে পারে।
  • আশপাশের লিম্ফ নোডগুলো ফুলে উঠতে পারে।

সাধারণত যেসকল কারণে থাইরয়েড ক্যান্সার হতে পারে

থাইরয়েড ক্যান্সার হওয়ার অন্যান্য কারণগুলি হল:

  • স্থূলতা।
  • থাইরয়েড ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস।
  • বিকিরণের প্রভাব।
  • কিছু উত্তরাধিকারীসূত্র সমস্যা
  • শরীরে আয়োডিনের ঘাটতি

ডায়াগনোসিস

থায়রয়েড ক্যানসার এমন একটি রোগ, যা সময়মতো চিকিৎসা করলে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ সম্ভব। তবে অবশ্যই সময়মতো সম্পূর্ণ চিকিৎসা করাতে হবে। গলার সামনে ফুলে উঠলে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞকে দেখানো উচিত। তিনি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবেন এটা কোন ধরনের রোগ।

কিছু পরীক্ষা আছে যা নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে বের করতে এবং থাইরয়েড ক্যান্সারের সম্ভাবনা নির্ণয়ে সাহায্য করে। এই পরীক্ষাগুলি হল:

  • রক্ত পরীক্ষা – রক্ত পরীক্ষা, যা থাইরয়েডের কার্যকারিতা পরীক্ষা নামে পরিচিত, রক্তপ্রবাহে থাইরয়েড হরমোনের অস্বাভাবিক মাত্রা জানার জন্য এটি সম্পন্ন করা হয়। এর মাত্রায় বৃদ্ধি থাইরয়েড ক্যান্সারের সম্ভাব্য অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
  • বায়োপসি অথবা FNAC
  • MRI স্ক্যান।

এছাড়াও থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের টেকনিসিয়াম স্ক্যান করে সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে আরও কিছু পরীক্ষা করা হয়। সরু সূচ দিয়ে গ্ল্যান্ড থেকে রস টেনে নিয়ে তার পরীক্ষা করা হয়, যাকে বলে ‘এফএনএসি’৷ ক্যানসার থাকলে ধরা পড়ে এতেই। থাইরোগ্লোবুলিন নামে ক্যানসার মার্কার পরীক্ষা করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে ক্যালসিটোনিন, জেনেটিক মার্কার ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়।

 

চিকিৎসা পদ্ধতি

থাইরয়েড ক্যান্সার একবার নির্ধারণ হওয়ার পরে, ডাক্তার রোগের অবস্থান স্থির করে (ক্যান্সারের তীব্রতা এবং বিস্তার নির্ধারন করেন) এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা স্থির করেন। থাইরয়েড ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক এবং সর্বাধিক প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলি হলঃ

  • তেজস্ক্রিয় আয়োডিন চিকিৎসা।(Radioiodine therapy) – রেডিও আয়োডিন থেরাপির মাধ্যমে অতিরিক্ত সক্রিয় থাইরয়েড কোষকে মেরে বা বর্ধিত থাইরয়েড গ্রন্থি সংকুচিত করে চিকিৎসা করা হয়।
  • থায়রয়েডেক্টমি – থাইরয়েড গ্রন্থি বা তার অংশ বাদ দিতে সার্জারি
  • রেডিওথেরাপি।
  • কেমোথেরাপি।

অন্যান্য

মানব শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ থাইরয়েড গ্রন্থি। শরীরের নানা হরমোন তৈরিতে এই গ্রন্থি কাজ করে থাকে। তবে থাইরয়েড কোন কারণে আক্রান্ত হলে শরীরে নানা অসঙ্গতি দেখা দেয়। থাইরয়েডের অনেকগুলো রোগ আছে। এর মধ্যে থাইরয়েড ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ। থাইরয়েড আক্রান্ত হলে প্রাথমিকভাবে রোগীর তেমন কোন সমস্যা অনুভূত হয় না। দেখা যায় না বড় কোন লক্ষণও। তাই ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার অনেক পরে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন । তখন অন্ত্রপাচার ছাড়া চিকিৎসা করা সম্ভব নয়।

থাইরয়েড ক্যান্সারের প্রকারভেদ

  • প্যাপিলারি থাইরয়েড ক্যান্সার: এই ক্যান্সার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় , কিন্তু অচিরেই গলার লিম্ফ নোড বা লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে
  • ফলিকিউলার থাইরয়েড ক্যান্সার: এই ক্যান্সার লিম্ফ নোড এবং রক্ত জালিকাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
  • মেডুলারি ক্যান্সার: এই ক্যান্সার সাধারণত প্রাথমিক স্তরেই ধরা পড়ে
  • অ্যানাপ্লাস্টিক ক্যান্সার: এই ক্যানসার সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায়। এবং এর চিকিৎসা করাও সবচেয়ে কঠিন।

সতর্কতার সঙ্গে কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে এই ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশেই এড়ানো যায়।