প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব

ক্যান্সার প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সবার একত্রিত হতে হবে।

ব্লাডার ক্যান্সার কি?

ব্লাডার ক্যান্সার বা মূত্রশয়ের ক্যান্সার হলো এমন একটি রোগ যাতে মূত্রশয়ের কোষগুলি উপরিউক্ত পদ্ধতিতে অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত হারে বাড়তে থাকে এবং ক্রমশঃ তা টিউমারে পরিণত হয়। এই টিউমার থেকেই প্রাথমিক ভাবে ক্যান্সারের সূচনা হয়। ব্লাডার বা মূত্রাশয় হলো আমাদের শরীরের নিম্নাংশে শ্রোণী বা পেলভিক অঞ্চলে অবস্থিত একটি ফাঁপা অঙ্গ যা আমাদের রেচনকার্যে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এই ব্লাডার বা মূত্রশয়ে সাধারণতঃ মূত্র জমা হয় এবং এর পেশীগুলি আমাদের মূত্রত্যাগের পরিমাণ ও প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ করে।

ব্লাডার ক্যান্সারের লক্ষণঃ

নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং স্ক্রিনিং টেস্ট করিয়ে নিন।

  • হিমাচুরিয়া অর্থাৎ প্রস্রাবের সাথে রক্তপাত হওয়া
  • বার বার প্রস্রাব হওয়া
  • মূত্র ত্যাগের সময় জ্বালা ভাব এবং যন্ত্রনা অনুভূত হওয়া
  • তলপেট ও কোমরের নীচের অংশে ব্যথা
  • ওজন কমে যাওয়া
  • পায়ের পাতা ফুলে ওঠা
  • ক্লান্তি এবং দুর্বলতা

সাধারণত যেসকল কারণে এই ক্যান্সার হতে পারে

  • ব্লাডারের প্রদাহ
  • পরিবারে কারোর ব্লাডার ক্যান্সার থাকলে এর সম্ভাবনা বাড়ে
  • অত্যধিক ধূমপান
  • ক্ষতিকর রাসায়নিক বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থের সংস্পর্শে আসা। বিশেষতঃ কাজের জায়গায় নিয়মিত ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসা
  • নির্দিষ্ট কিছু মধুমেহ অর্থাৎ ডায়াবেটিসের ওষুধ নিয়মিত গ্রহণ করার ফলেও ব্লাডার ক্যান্সার হতে পারে।
  • বয়স বাড়ার সাথে সাথে ব্লাডার ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
  • ধূমপান যে অন্যান্য ক্যান্সারের সঙ্গে ব্লাডার ক্যান্সারের ঝুঁকির আশঙ্কা বাড়ায়
  • ভেপিং এবং ই সিগারেট ব্যবহারও বাড়িয়ে দিচ্ছে ব্লাডার ক্যান্সারের আশঙ্কা।

ডায়াগনোসিস

ব্লাডার ক্যান্সার হয়েছে কিনা জানার জন্য চিকিৎসকেরা সাধারণতঃ যেসব পরীক্ষা নিরীক্ষা করবার পরামর্শ দিয়ে থাকেন, সেগুলি হলোঃ

  • ডিজিটাল রেক্টাল পরীক্ষা: এই পরীক্ষা করার জন্য চিকিৎসকেরা হাতে দস্তানা অর্থাৎ গ্লাভস পরে রেক্টাম বা পায়ুর মধ্য দিয়ে আঙুল প্রবেশ করান, এবং এইভাবে পায়ুপথে কোনো টিউমার আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখেন।
  • ইউরিনালিসিস: এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রস্রাবের সাথে রক্ত ও অন্যান্য কোনো পদার্থ নির্গত হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষন করে দেখা হয়।
  • ইউরিন টিউমার মার্কার: শরীরে ক্যান্সার আক্রান্ত কোষ থেকে কোনো পদার্থ নিঃসৃত হচ্ছে কিনা, তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়। এই পদ্ধতিতে মূত্রাশয়ে একটি ভিডিও ক্যামেরা যুক্ত সরু নলাকার যন্ত্র প্রবেশ করানো হয়। এরপর, ইনজেকশনের দ্বারা লবণ জল মূত্রাশয়ে প্রবেশ করানো হয়। যন্ত্রে অবস্থিত ভিডিও ক্যামেরার দ্বারা পরীক্ষাকারী চিকিৎসক মূত্রাশয়ের অভ্যন্তরের অবস্থা পরিষ্কার ভাবে দেখতে পান। এর ফলে সহজেই রোগ নিরূপণ করা সম্ভব হয়।
  • ইউরিন কালচার: এই পরীক্ষার মাধ্যমে মূত্রাশয়ে কোনো রোগজীবাণু সংক্রমণ হয়েছে কিনা জানা যায়।
  • ট্রান্স ইউরেথ্রাল রিসেকশান অফ ব্লাডার টিউমার (TURBT) বা অপারেশনের মাধ্যমে মূত্রাশয়ের টিউমার বাদ দেওয়া: এই অপারেশনের দ্বারা চিকিৎসক মূত্রাশয়ে অবস্থিত টিউমার এবং তার আশেপাশের কিছু পেশী ও কোষ কেটে বার করেন। এরপর ওই টিউমার ও পেশির নমুনা সংগ্ৰহ করে গবেষণাগারে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। এবং এই পরীক্ষা থেকে টিউমারটি ক্যান্সার আক্রান্ত হয়েছে কিনা তা জানা যায়।
  • ইন্ট্রাভেনাস পাইলোগ্রাম (IVP): এই পদ্ধতিতে চিকিৎসক ইনজেকশনের মাধ্যমে ডাই বা একপ্রকার রঙ শরীরে প্রবেশ করান। এই রঙ শিরার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে মূত্রাশয় এবং মূত্রনালীতে থাকা টিউমার এবং অন্যান্য ক্যান্সার আক্রান্ত অংশগুলিকে চিহ্নিত করে।
  • রেট্রোগ্রেড পাইলোগ্রাম: এই পদ্ধতিতে চিকিৎসক আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ক্যাথিটার (একধরনের সরু, নলাকার উপকরণ) মূত্রনালী ও মূত্রাশয়ের মাধ্যমে প্রবেশ করান। এরপর ওই নলাকার উপকরণ দ্বারা ডাই বা রঙ প্রবেশ করালে মূত্রাশয়ের প্রাচীর স্পষ্ট ভাবে বোঝা যায়। যদি মূত্রাশয়ে কোনো টিউমার থাকে, তা এই পদ্ধতিতে নিখুঁত ভাবে বোঝা যায়।
  • সিটি স্ক্যান
  • এম আর আই
  • আল্ট্রাসাউন্ড
  • বোন বা হাড়ের স্ক্যান
চিকিৎসা পদ্ধতি

এই ক্যানসার ধরা পড়লে সাধারণত নিচের চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো কার্যকর হতে পারেঃ

  • সার্জারি
  • কেমোথেরাপি
  • রেডিওথেরাপি
  • ব্র্যাকিথেরাপিঃ ব্র্যাকিথেরাপি হলো এক ধরণের ইন্টারনাল বীম রেডিয়েশন থেরাপি অর্থাৎ উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন রেডিয়েশন ব্যবহার করে ক্যান্সারের চিকিৎসা। এই পদ্ধতিতে শক্তিশালী রেডিয়েশন বা বিকিরণ ক্যান্সার আক্রান্ত স্থানে প্রয়োগ করে ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলিকে ধ্বংস করা হয় এবং এই ভাবে, টিউমারটি সঙ্কুচিত করার প্রচেষ্টা করা হয়। এই উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন রেডিয়েশন ক্যান্সার কোষগুকির ডি এন এ ধ্বংস করে তাদের নির্মূল করে। ডি এন এ ক্ষতিগ্রস্ত হবার ফলে অস্বাভাবিক কোষগুলি আর বিভাজিত হতে পারেনা, ফলে তাদের আর সংখ্যা বৃদ্ধিও হয়না। এর ফলে ক্রমশঃকোষগুলির মৃত্যু হয় , এবং শরীরের স্বাভাবিক নিয়মেই তারা ক্রমশঃ শরীর থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
  • ইমিউনোথেরাপি

রোগীর শারীরিক অবস্থা ও ক্যান্সারের ধরণ অনুযায়ী চিকিৎসক সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারন করবেন।ধতি

অন্যান্য

ইউরোলজিস্ট, রেডিয়েশন অঙ্কোলজিস্ট এবং মেডিক্যাল অঙ্কোলজিস্টদের তত্ত্বাবধানে ব্লাডার ক্যানসারের চিকিৎসা করা হয়। ক্যানসার মুক্ত হওয়ার পরেও নির্দিষ্ট সময় অন্তর ফলো আপ করানো উচিত। সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন, পর্যাপ্ত জলপান ক্যানসার সহ অনেক অসুখকে আটকে দিতে পারে। ধূমপান না ছাড়লে ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি অনেক বেশি। প্রসেস করা মাংস, বিশেষ করে রেড মিট (সসেজ, সালামি ইত্যাদি) বেশি খেলে ক্যানসার ফিরে আসতে পারে।

সতর্কতার সঙ্গে কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে এই ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশেই এড়ানো যায়।