প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব

ক্যান্সার প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সবার একত্রিত হতে হবে।

জরায়ুমুখ ক্যান্সারই একমাত্র ক্যান্সার যার টিকা আছেঃ HPV ভ্যাক্সিন।

৯ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোরীরা দুই ডোজ এবং ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সীরা তিন ডোজ টিকা নিলেই এ রোগ থেকে অনেকটা মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

জরায়ুমুখ ক্যান্সার কি?

জরায়ুমুখ ক্যান্সার হয় এক ধরনের ভাইরাসের আক্রমণে, যার নাম “হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস”। আর এটি ছড়ায় ওই ভাইরাস আছে এমন কারো সাথে যৌনমিলন হলে। যৌনমিলনের সময় পুরুষের কাছ থেকে নারীদেহে এই ভাইরাস ঢুকে যায়। ভাইরাসটি ঢোকার সাথে সাথেই ক্যান্সার হয় না, ক্যান্সার হতে বেশ কয়েক বছরও লাগতে পারে। যখন নারীর শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় তখনই এই ভাইরাসটি ক্যান্সার রোগের সৃষ্টি করে।

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের লক্ষণঃ

নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং স্ক্রিনিং টেস্ট করিয়ে নিন।

• ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অনেক সময় স্থায়ীভাবে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও রক্তস্রাব দেখা দেওয়া।
• সহবাসের সময় জরায়ুতে ব্যথা অনুভূত হওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণও হওয়া।
• যোনিপথে বাদামি বা রক্তস্রাব দেখা দেওয়া।
• দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব হওয়া।
• হঠাৎ করেই ওজন হ্রাস বা বৃদ্ধি হওয়া।
• খাবারে অনীহা, বমি ভাব কিংবা বমি হওয়া।
• নিচের দিকে পেট ফুলে যাওয়া।
• জরায়ুর চারপাশে চাপা লাগা এবং ঘন ঘন মূত্রত্যাগ করা।

 

সাধারণত যেসকল কারণে ব্লাড ক্যান্সার হতে পারে

হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসকে (এইচপিভি) জরায়ুমুখ ক্যানসারের অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাক। ১০০টিরও বেশি প্রজাতির এইচপিভি ভাইরাস আছে; এর মধ্যে এইচপিভি ১৬ এইচপিভি ১৮ মূলত ৭০ শতাংশ জয়ায়ুমুখ ক্যানসারের জন্য দায়ী। কিছু কারণ রয়েছে, যা এই ক্যানসারে আক্রান্তের ঝুঁকিকে ত্বরান্বিত করে। যেমনঃ

• বাল্যববিাহ।
• কম বয়সে গর্ভধারণ এবং অধিক সন্তান প্রসব করা।
• অনিরাপদ যৌনমিলন এবং একাধিক সঙ্গীর সঙ্গে সহবাস করা।
• র্দীঘদিন গর্ভনিরোধক ওষুধ সেবন।
• অপরিচ্ছন্ন থাকা, ধূমপান, মদ্যপান।
• ৩৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী নারীদের জরায়ুমুখ ক্যানসারের ঝুঁকি অনেক বেশি।

ডায়াগনোসিস

নিয়মিত পরীক্ষা এবং সঠিক সময়ে জরায়ুমুখের ক্যান্সার নির্ণয় করা গেলে, এটিকে সম্পূর্ণ নিরাময় করা যায়।

জরায়ুমুখের ক্যান্সার নির্ণয়ের পদ্ধতি: ভায়া (Visual Inspection with Acetic acid বা VIA) টেস্ট বা ভায়া পরীক্ষা জরায়ু মুখের ক্যান্সার নির্ণয়ের একটি সাধারণ পদ্ধতি। জরায়ু মুখের ক্যান্সার নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অন্যান্য পরীক্ষাগুলোর মধ্যে ভায়া পরীক্ষা উল্লেখ্যযোগ্য। কারণ এই পরীক্ষাটি দেশের সব সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল, মা ও শিশু স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্রসহ নগরের প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হচ্ছে।

চিকিৎসা পদ্ধতি

জরায়ুমুখ ক্যানসারের চিকিৎসা বেশ কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন: ক্যানসারের স্টেজ, ক্যানসার শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়ে পড়েছে কি না, রোগীর বয়স, স্বাস্থ্যের অবস্থা ইত্যাদি।

জরায়ুমুখ ক্যানসারের প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতি হলোঃ

  • সার্জারিঃ ক্যানসার খুব বেশি ছড়িয়ে না পড়লে বা প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলে সার্জারি করা যায়। এটি জরায়ুমুখ ক্যানসার চিকিৎসার একটি অংশ হতে পারে। সার্জারিতে সাধারণত জরায়ুমুখের যে অংশে টিউমার আছে, সেই অংশসহ আশপাশের কিছু টিস্যু অপসারণ করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ জরায়ুমুখ অপসারণ করা হয়। সার্জারির পরে সাধারণত রেডিয়েশন বা কেমোথেরাপি দেওয়া হয়।
  • রেডিওথেরাপি
  • কেমোথেরাপি
  • ইমিউনোথেরাপি
  • টার্গেটেড থেরাপি।
অন্যান্য

জরায়ুমুখের ক্যানসার যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। মেয়েদের ভ্যাকসিন নিতে উদ্ধুদ্ধ করতে হবে।

জরায়ুমুখের ক্যানসার নির্ণয়ের পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপ, অর্থাৎ ভায়া টেস্ট করানোটা অত্যন্ত সহজ। কোনো ব্যথা লাগে না। সময়ও লাগে মাত্র এক মিনিট। যেসব নারীর বয়স ৩০ থেকে ৬০-এর মধ্যে তাদের প্রতি ৫ বছর পরপর ভায়া টেস্ট করানো দরকার।

বাংলাদেশের সকল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সরকারি জেলা সদর হাসপাতাল, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, এমনকি নির্বাচিত কিছু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে, এনজিও ক্লিনিকগুলোতে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা বোঝার এই ভায়া টেস্ট বিনামূল্যে করা হয়।

অবহেলা বা সংকোচ না করে নিজের ও আপনার পরিবারের প্রতি ৫ বছর পরপর নিয়মিত জরায়ুমুখ ক্যানসারের প্রাথমিক পরীক্ষা অর্থাৎ ভায়া টেস্ট করুন। জরায়ুমুখ ক্যানসার থেকে নিরাপদ থাকুন।

এছাড়া জরায়ুমুখ ক্যানসারই একমাত্র ক্যানসার যার টিকা আছে। মাসিক শুরুর পরপরই এবং যৌন সম্পর্ক শুরু কিংবা বিয়ের আগে টিকা নিলে এই ক্যানসার থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব।

সতর্কতার সঙ্গে কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে এই ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশেই এড়ানো যায়।