প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব

ক্যান্সার প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সবার একত্রিত হতে হবে।

কোলন ক্যান্সার কি?

আমাদের খাদ্য পরিপাক এবং খাদ্যের যে নালি টি রয়েছে সেটার নিচের যে অংশ রয়েছে একে বলা হয় কোলন বা বৃহদন্ত্র। কোলন/বৃহদন্ত্র অঞ্চলে শুরু হওয়া ক্যান্সার কোলন ক্যান্সার নামে পরিচিত, যখন মলদ্বারে ক্যান্সার রেকটাল ক্যান্সার নামে পরিচিত।

বিশ্বব্যাপী  মার্চের প্রথম শুক্রবার আন্তর্জাতিক কোলন ক্যান্সার দিবস পালিত হয়।

কোলন ক্যান্সারের লক্ষণঃ

নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং স্ক্রিনিং টেস্ট করিয়ে নিন।

  • দিনে কত বার মল ত্যাগের প্রয়োজন অনুভূত হয়, আচমকা তার তারতম্য ঘটা কোলন ক্যানসারের অন্যতম লক্ষণ।
  • আচমকা বমি বমি ভাব, গা গুলিয়ে ওঠা, ওজন কমে যাওয়াও কোলন ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।
  • কোলন ক্যানসারের রোগীদের মল ত্যাগের সময় ব্যথা ও যন্ত্রণা অনুভূত হতে পারে। মলত্যাগের পরেও মল রয়ে যাওয়ার অনুভূতি দেখা যায়। সরু ফিতের মতো মল নির্গত হওয়াও কোলন ক্যানসারের উপসর্গ হতে পারে।
  • মলদ্বারে রক্তপাত কোলন ক্যানসারের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। অর্শ্বের সমস্যাতেও মলদ্বারের রক্তপাত হয়। তবে এই রক্তপাতের মধ্যেও রয়েছে তারতম্য। অর্শ্ব রোগীদের ক্ষেত্রে যে রক্তপাত হয় তা সাধারণত লাল। অপর দিকে কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এই রক্ত কালচে রঙের হয়। কালচে রং দেহের অভ্যন্তর থেকে নির্গত রক্তের সূচক।
  • পেট ব্যথাও কোলন ক্যানসারের অন্যতম মুখ্য একটি উপসর্গ।
  • পেট সবসময় ভরা লাগে
  • ওজন কমে যাওয়া
  • কোলন ক্যানসারে যেহেতু অন্ত্র থেকে রক্তপাত হয় তাই, এটি রক্তাল্পতা তৈরি করে। রক্তাল্পতা ডেকে আনে দুর্বলতা ও ক্লান্তি।

তবে মনে রাখা দরকার, সাধারণ মানুষের পক্ষে কোলন ক্যানসারের লক্ষণ বুঝে ওঠা অত্যন্ত কঠিন। কাজেই এই ধরনের যে কোনও উপসর্গ দেখা গেলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বিচক্ষণতার পরিচয়।

 

সাধারণত যেসকল কারণে কোলন ক্যান্সার হতে পারে

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা এনএইচএস’এর তথ্য অনুযায়ী কোলন ক্যান্সারের নির্দিষ্ট কোন কারণ জানা যায় না, তবে কিছু কিছু বিষয় এই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সেগুলো হলঃ

  • বয়স – কোলন ক্যান্সারে ভুগতে থাকা প্রতি ১০ জনের ৯ জনের বয়সই ৬০ বা তার চেয়ে বেশি।
  • খাদ্যাভ্যাস – অতিরিক্ত মাংস খাওয়া এবং খাদ্য তালিকায় ফাইবার সমৃদ্ধ খাবারের স্বল্পতা থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
  • ওজন – অতিরিক্ত ওজন যাদের রয়েছে, তাদের মধ্যে এই ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
  • ব্যায়াম – যথেষ্ট শারীরিক পরিশ্রম না করা হলে কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • মদ্যপান ও ধূমপান – মদ্যপান ও ধূমপান কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
  • পারিবারিক ইতিহাস – পরিবারের কোনো সদস্যের (বাবা, মা বা ভাই, বোন) যদি ৫০ এর কম বয়সে কোলন ক্যান্সার হয়, তাহলে ঐ ব্যক্তিরও ক্যান্সারের সম্ভাবনা বাড়ে।
ডায়াগনোসিস

প্রধান উপাদান কোলন্সকোপি ও বায়োপসি।  বায়োপসি’র মাধ্যমে ক্যান্সার নির্ণয়ের পর সিটি স্ক্যান, রক্তে এন্টিজেন (CEA) এর পরিমাণ ইত্যাদি বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সারের ধাপ নির্ণয় (staging) করা হয়।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই ধাপ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক ধাপের (Stage I & II) ক্যান্সারগুলোর চিকিৎসা পরবর্তী ফলাফল সন্তোষজনক।

ক্যান্সার কোলনের বাইরে ছড়িয়ে গেলে (লসিকাগ্রন্থি, যকৃত, ফুসফুস ইত্যাদি) তাকে অগ্রসর ধাপ বলে বিবেচনা করা হয়।

তবে আশার কথা এই যে, অন্যান্য ক্যান্সারের চেয়ে কোলন ক্যান্সারের চিকিৎসা পরবর্তী ফলাফল অনেক ভালো। এমনকি অগ্রসর ধাপের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীও সঠিক চিকিৎসা পেলে বহুদিন সন্তোষজনক ভাবে বেঁচে থাকতে পারেন।

চিকিৎসা পদ্ধতি

কোলন ক্যান্সারের চিকিৎসা এক-কথায় সার্জারি। সার্জারির আগে বা পরে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। অপারেশনের সময় রেডিওথেরাপির ব্যবহার এখনও গবেষণাধীন।

চিকিত্সার পরে, ক্যান্সার ফিরে না আসে তা নিশ্চিত করার জন্য রোগীদের নিয়মিত ক্যান্সার স্ক্রিনিং করতে হবে, সাধারণত নিয়মিত কলোনস্কোপি এবং সিটি স্ক্যান করা হয়।

সার্জন, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, সাইকোথেরাপিস্ট, প্যাথলজিস্ট, ক্যান্সার কেয়ার নার্সসহ সকলের মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের জন্য।

অন্যান্য

একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন যে, ক্যান্সার কঠিন রোগ হলেও এর উপযুক্ত চিকিৎসা রয়েছে। রোগীদের সচেতনতা এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।  যে কোনো রোগ সম্পর্কে পরিচিত জনের পরামর্শ না নিয়ে নূন্যতম এমবিবিএস চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আপনার সচেতনতা রোগটিকে প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয়ে সাহায্য করবে। আর প্রথম দিকে ধরতে পারলে ক্যান্সারের মতো কঠিন রোগও সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব। কাজেই সচেতনতার পরিচয় দিন, সুস্থ থাকুন

সতর্কতার সঙ্গে কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে এই ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশেই এড়ানো যায়।