প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব

ক্যান্সার প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সবার একত্রিত হতে হবে।

স্তনের ক্যান্সার কি?

স্তনের কিছু কোষ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে, ওই অনিয়মিত ও অতিরিক্ত কোষগুলো বিভাজনের মাধ্যমে টিউমার বা পিণ্ডে পরিণত হয়। সেটি রক্তনালীর লসিকা (কোষ-রস) ও অন্যান্য মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এই ছড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাই ক্যান্সার।

গত কয়েক বছর ধরে, উন্নত চিকিৎসা ও আধুনিকতম প্রযুক্তি স্তন ক্যান্সারে প্রাথমিক স্টেজে সনাক্তকরণ এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়তা করেছে।

বিশ্বব্যাপী ১৯ অক্টোবর আন্তর্জাতিক স্তন ক্যান্সার দিবস পালিত হয়।

ডাকটাল কার্সিনোমা: দুধ উৎপাদক ডাক্টস গুলো তে ক্যান্সার।
লোবুলার কার্সিনোমা: গ্রন্থি টিস্যু ক্যান্সার।
অন্তলীন স্তন কার্সিনোমা: উপরে উল্লিখিত স্তন কার্সিনোমা পার্শ্ববর্তী টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়লে, তাদেরকে অন্তর্লীন ডাকটাল কার্সিনোমা এবং অন্তলীন লোবুলার কার্সিনোমা বলা হয়।

স্তন ক্যান্সারের অন্যান্য সাধারণ প্রকারের মধ্যে রয়েছে মেডুলারি কার্সিনোমা,মিউসিনাস কার্সিনোমা, পেপিলারি কার্সিনোমা, প্রদাহজনক কার্সিনোমা ।

স্তন ক্যান্সারের লক্ষণঃ
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং স্ক্রিনিং টেস্ট করিয়ে নিন।

  • স্তনে ব্যথা– নানা কারণে কিন্তু স্তনের পেশিতে ব্যথা হতে পারে। বিশেষত পিরিয়ডসের আগে কিংবা পরে এই সব সমস্যা থাকে। কিন্তু যদি দেখেন যে স্তনে কোনও লাম্ফ হয়েছে, কোনও জায়গায় শক্ত বোধ হচ্ছে, সেই জায়গা টিপলে ব্যথা করছে তাহলে কিন্তু যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের কাছে যান।
  • স্তনবৃন্ত থেকে কোনও তরল নির্গত হলে– যাঁরা সদ্য মা হয়েছেন কিংবা সন্তানকে স্তন্যপান করান তাঁদের ক্ষেত্রে তিন বছর বয়স পর্যন্ত এই লক্ষণ থাকে। স্তন্যপান করানোর জন্যই স্তনবৃন্ত থেকে তরল নির্গত হয়। কিন্তু যিনি স্তন্যপান করান না তাঁর ক্ষেত্রে যদি এই লক্ষণ দেখা যায় তাহলে তা কিন্তু মোটেই সুবিধের নয়। আর সেই নিঃসৃত তরলের মধ্যে রক্ত মিশে থাকলে তা শরীরের জন্য আরও বেশি উদ্বেগের।
  • স্তনের রং এবং আকৃতির পরিবর্তন– স্তনের রং যদি পরিবর্তন হতে থাকে, লালচে ভাব, চুলকানি এসব তাকে তাহলে কিন্তু প্রথম থেকেই সাবধান হতে হবে। সেই সঙ্গে নজর রাখুন স্তনের আকৃতিতেও। হঠাৎ করেই যদি কোনও পরিবর্তন আসে কিংবা স্তন ফুলে যায় তাহলে কিন্তু তা হতে পারে ক্যানসারের লক্ষণ। যে কারণে নিজে থেকে পরীক্ষা করানো এত জরুরি।

এছাড়াও স্তনে অতিরিক্ত কোনও মাংসপিণ্ড হলে এবং তা স্তনের বাইরের দিকে প্রসারিত হলে সতর্ক হন। যদি বগলে অতিরিক্ত মাংসপিণ্ড হয়, বগলের আশপাশে ফোলা, ব্যথা ভাব থাকে তাও কিন্তু হতে পারে স্তন ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কি।

  • স্তনে চাকা বা পিণ্ড দেখা দিলে
  • স্তনের বোঁটার কোন ধরনের পরিবর্তন, যেমন ভেতরে ঢুকে গেলে, অসমান বা বাঁকা হয়ে গেলে
  • স্তনের বোঁটা দিয়ে অস্বাভাবিক রস বের হলে
  • স্তনের চামড়ার রং বা চেহারায় পরিবর্তন হলে
  • বগলে পিণ্ড বা চাকা দেখা গেলে

 

মেটাস্ট্যাটিক স্তন ক্যান্সার: স্তন ক্যান্সার রক্ত ​​বা লিম্ফ থেকে দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে, এই প্রক্রিয়াটিকে মেটাস্ট্যাসিস বলা হয়। মেটাস্ট্যাটিক স্তন ক্যান্সার হাড়, ফুসফুস, লিভার, হৃদয় এবং মস্তিষ্কের মতো অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

পুরুষ স্তন ক্যান্সার: এটি একটি বিরল স্তন ক্যান্সার এর প্রকার । পুরুষ স্তন ক্যান্সার সাধারণত নির্দিষ্ট ওষুধ বা অস্বাভাবিক হরমোন (এস্ট্রোজেন) মাত্রা বা স্তন ক্যান্সারের পূর্ব পারিবারিক ইতিহাসের ফলে হয়।

সাধারণত যেসকল কারণে স্তন ক্যান্সার হতে পারে

  • অনেক বেশি বয়স পর্যন্ত বিয়ে না করা এবং ৩০ বছর বয়সের পর নারীদের প্রথম সন্তানের মা হওয়া কিংবা সন্তান না নেয়া মহিলাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়।
  • যারা অতিরিক্ত ফ্যাটযুক্ত খাবার খান এবং খাদ্যতালিকায় একেবারেই শাক সবজি রাখেন না তাদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এছাড়াও দীর্ঘসময় টিনজাত খাবার খাওয়া, প্রিজারভড খাবার, কৃত্তিম মিষ্টি ও রঙযুক্ত খাবার খাওয়া নারী ও পুরুষের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার জন্য দায়ী।
  • দেরিতে সন্তান নেয়া।
  • সন্তানকে নিয়মিত বুকের দুধ না খাওয়ানোর অভ্যাসের কারণে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে দেখা যায়।
  • বেশি বয়স, গড় আয়ু বেড়ে যাওয়াতে এ রোগের প্রকোপ বাড়ছে।

ডায়াগনোসিস

প্রথমেই বিশেষজ্ঞরা রোগীর রোগের History জেনে নেন এবং শারীরিক পরীক্ষা করেন। বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে ব্রেস্ট ক্যান্সার শনাক্ত করা হয়। রোগীর বয়সের সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে চিকিৎসকরা বিভিন্ন ধরণের স্ক্রিনিং টেস্ট করতে বলেন। যেমনঃ

  • ম্যামোগ্রাফি
  • আলট্রাসনোগ্রাফি
  • এমআরআই
  • FNAC -চাকা থেকে
  • বায়োপসি পরীক্ষা
চিকিৎসা পদ্ধতি
প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব হয়। এ ক্যান্সারের চিকিৎসা প্রধানত কয়েকভাগে বিভক্ত-

  • সার্জারি
    • লাম্পেক্টমিতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা হয় এবং পার্শ্ববর্তী টিস্যুর কিছু অংশ স্তনের অবশিষ্ট অংশ অক্ষত রেখে দেওয়া হয়। 
    • মাস্টেক্টমি হল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুরো স্তন অপসারণ।
    • অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে উভয় স্তন অপসারণকে ডাবল মাস্টেক্টমি বলা হয়। 
  • কেমোথেরাপি
  • রেডিওথেরাপি
  • হরমোন থেরাপি
  • টার্গেটেড থেরাপি

রোগীর শারীরিক অবস্থা ও ক্যান্সারের ধরণ অনুযায়ী চিকিৎসক সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারন করবেন।

অন্যান্য

  • Breast Self-Exam (BSE) নামে একটা টেস্ট আছে যা ঘরে বসে পরীক্ষা করা যায়। এই ভিডিওতে আরো বিস্তারিত জানতে পারবেনঃ Self Breast Examination
  • প্রয়োজনে গাইনোকলজিস্টের সাথে পরামর্শ নিন। ৬ মাসে বা অন্তত বছরে একবার ব্রেস্টে আল্ট্রাসনোগ্রাম করুন (ডাক্তারের পরামর্শে)।  কষ্টকর মনে হলেও, গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ আপনি বা আপনার প্রিয়জনের জীবনের গুরুত্ব নিশ্চয় আপনার কাছে অনেক বেশি।
    নিজ নিজ প্রিয় মানুষদের স্তন ক্যান্সারের ব্যাপারে সচেতন করুন, কারণ স্ত-ন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পরলে সহজে নিরাময়যোগ্য।
  • রোগীদের কেমোথেরাপির সময় রক্তের প্লাটিলেট, হিমোগ্লোবিন কমে যেতে পারে। হিমোগ্লোবিন বাড়াতে আনার, বিটরুটের জুস খেতে হবে। বিভিন্ন শাক এবং আমিষের সাথে লেবুর রস মিশিয়ে খেতে হবে, কারণ ভিটামিন সি সাধারণত আয়রন পরিশোষণে সহায়তা করে। আরো বিস্তারিত পড়ুনঃ Patient’s Diet

সতর্কতার সঙ্গে কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে এই ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশেই এড়ানো যায়।